📰 স্ত্রীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মানেই মানসিক নির্যাতন: যুগান্তকারী রায় কেরালা হাইকোর্টের
কেরালা: স্ত্রীর চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা, তাঁর চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা বা প্রতিনিয়ত নজরদারি চালানো—এসব আচরণকে গুরুতর মানসিক নির্যাতন হিসেবে ঘোষণা করল কেরালা হাইকোর্ট।
বিচারপতি দেভান রামচন্দ্রন এবং বিচারপতি এম.বি. স্নেহলতা সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ সম্প্রতি এক ঐতিহাসিক রায়ে বলেন, “স্ত্রীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও ক্রমাগত সন্দেহপ্রবণ আচরণ দাম্পত্য জীবনকে জীবন্ত নরকে পরিণত করে।”
🔹 মামলা ও রায়ের প্রেক্ষাপট
এই মামলায় আবেদনকারী ছিলেন এক নার্স, যিনি অভিযোগ করেন যে তাঁর স্বামী তাঁকে বারবার অবিশ্বস্ততার সন্দেহে মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন, চলাফেরার উপর নজরদারি চালাতেন এবং অবশেষে তাঁকে নিজের পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন।
পারিবারিক আদালত আগেই এই অভিযোগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। তবে হাইকোর্ট সেই রায় বাতিল করে বলেন, “স্ত্রীর স্বাধীনতা ও আত্মসম্মান লঙ্ঘন করা মানসিক নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পড়ে, এবং এটি বিবাহবিচ্ছেদের বৈধ কারণ।”
🔹 আদালতের পর্যবেক্ষণ
রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে—
> “পারস্পরিক বিশ্বাসই বিবাহের আত্মা। যখন বিশ্বাসের জায়গা নেয় সন্দেহ, তখন সম্পর্কের সব অর্থ হারিয়ে যায়।”
আদালত আরও জানায়, বিবাহের তিনটি স্তম্ভ—বিশ্বাস, মর্যাদা ও মানসিক নিরাপত্তা—কোনো অবস্থাতেই ক্ষুণ্ণ করা চলবে না।
স্বামী যদি অভ্যাসবশত স্ত্রীর প্রতি সন্দেহ পোষণ করেন, তাহলে তিনি কেবল স্ত্রীর আত্মসম্মানই ভঙ্গ করেন না, বরং তাঁর মানসিক শান্তিও ছিনিয়ে নেন।
🔹 মানসিক নির্যাতনের সংজ্ঞায় নতুন দৃষ্টান্ত
কেরালা হাইকোর্টের মতে, নজরদারি করা, পেশা ছাড়তে বাধ্য করা বা চলাফেরায় বাধা দেওয়া—এই সমস্ত কাজ আধুনিক সমাজে মানসিক নিষ্ঠুরতার বাস্তব উদাহরণ।
আদালত রূপা সোনি বনাম কমলনারায়ণ সোনি এবং রাজ তালরেজা বনাম কবিতা তালরেজা মামলার দৃষ্টান্ত টেনে উল্লেখ করেছে যে, “নিষ্ঠুরতা” শুধু শারীরিক নয়—মানসিকভাবে প্রতিনিয়ত অপমান, ভয় বা সীমাবদ্ধতার অনুভূতি তৈরি করাও একইভাবে অপরাধ।
🔹 সংবিধানিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা
এই রায়ের মাধ্যমে আদালত ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ-এর আলোকে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—
> “প্রত্যেক নাগরিকেরই স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার আছে, যা বিবাহের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।”
বিচারপতি স্নেহলতা বলেন, মানসিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে নথিগত প্রমাণ সবসময় পাওয়া সম্ভব নয়; বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য ও আচরণের ধারাবাহিকতাই আদালতের কাছে যথেষ্ট।
🔹 সামাজিক প্রভাব
আইনজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে বহু বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত মামলায় দিকনির্দেশক হয়ে উঠবে। সমাজে এখনও বহু নারী তাঁদের স্বাধীনতা হারিয়ে নীরবে মানসিক নির্যাতন সহ্য করেন। কেরালা হাইকোর্টের এই রায় তাঁদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ আইনগত অস্ত্র হতে পারে।